বিজয়ের ৪৭ বছর: আজও নিষিদ্ধ হয়নি যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি

বিজয়ের ৪৭ বছর: আজও নিষিদ্ধ হয়নি যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন। ২ নং সেক্টরের এই যোদ্ধা অংশগ্রহণ করেছেন অসংখ্য সম্মুখযুদ্ধে।
বলছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সেইসব গৌরবগাঁথা। প্রাণের চেয়ে প্রিয় ‘মা’কে সালাম করে প্রাণপ্রিয় দেশের মুক্তির সংগ্রামে সম্মুখযুদ্ধে একের পর এক ঝরে যেতে যেতে দেখেছেন প্রিয় সহযোদ্ধাদের প্রাণ। পাক হানাদার বাহিনী ও তার দালালদের হাতে ধরাও পড়েছেন একবার। সয়েছেন অসহনীয় নির্যাতন।

আঘাতের স্থানগুলো বার বার দেখাচ্ছিলেন। চোঁখ টলমল করছিলো এই বীর সেনার। তবে সবচেয়ে বড় যে আঘাতটি পেয়েছেন, তা তিনি দেখাতে পারছিলেন না। সে আঘাত কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে ৪৭ বছর যাবৎ।

বিজয়ের ৪৭ বছর পার করেছে বাংলাদশ। যুদ্ধাপরাধীদের আস্ফালন, রাজাকার মন্ত্রী, জঙ্গীবাদের অভয়ারণ্যের দিনগুলোও পার করেছে বাংলাদেশ। বিএনপির সরাসরি মদদে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত চলে আসে ক্ষমতার শীর্ষে। যুদ্ধাপরাধীদের পালের গোদা হিসেবে কুখ্যাত গোলাম আযমকে জামাই আদরে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন পাকিস্তানের এজেন্ট জিয়াউর রহমান। এছাড়াও অন্যান্য শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীরাও পলাতক জীবনের অবসান ঘটান।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার যাদেরকে দালাল আইনে গ্রেফতার করেছিলো, তাদের রাজনৈতিক জীবন দান করেন জিয়াউর রহমান।

চমকের বাকি ছিল আরও। সে চমক দেখতে বেশি দিন অপেক্ষাও করতে হয়নি। জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া জোট বাঁধেন যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে। এখানেই থামেননি তিনি। যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী করেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে তুলে দেয়া হয় পবিত্রতম পতাকা। দেশকে করে তোলা হয় জঙ্গীবাদ ও উগ্র মতাদর্শের ঘাঁটি।

সেসব দিন পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। সাম্য, উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পথে আজ দুর্দম্য বাংলাদেশ। কিন্তু দেশপ্রেমিক বাঙালির বুকে যে ক্ষত জমে আছে আলতাফ হোসেনের মতো, তা মুছতে আর কতদিন প্রয়োজন, সে প্রশ্ন অনেকেরই।

দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধীতা করে যেসব রাজনৈতিক দল পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যা, নারী নির্যাতন আর নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল বাংলার মুক্তিকামী জনতার ওপরে, তারাই এখন স্বাধীন দেশে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ব্যাপারটি এমন নয় যে, এটাই প্রথম।

এই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে এরাই কলঙ্কিত করেছিল ২০০১ সালের নির্বাচনে। দুইজন কুখ্যাত আল-বদর কমান্ডার এদেশে মন্ত্রী হয়েছিল। সাঈদী, সাকা চৌধুরীর মতো যুদ্ধাপরাধীরা এদেশের পবিত্র সংসদকে কলঙ্কিত করেছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের একেবারে শুরু থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুরু করলেও পঁচাত্তরের পর এই বিচার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ দিনের সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি আনে।

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিচার কাজও শুরু করে তারা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে আশাব্যঞ্জক ও কার্যকর অগ্রগতি হলেও এখনও বিচারকার্য চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকগুলো সত্য আমাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। এই বিচারকার্য পরিচালনার সময়েই আমরা দেখেছি, যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন ও তাদের পরিবারের সদস্যরা কীভাবে আন্তর্জাতিক মহলে চক্রান্ত করেছে এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য।

আমরা দেখেছি, যুদ্ধাপরাধীদের দোসররা রাজনৈতিকভাবে এখনও সক্রিয় রয়েছে এদেশকে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ও অর্থায়ণে যুদ্ধাপরাধীদের পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ত থাকার ঘটনাও নানা সময়ে তথ্য-প্রমাণসমেত গণমাধ্যমে ওঠে এসেছে।

সম্প্রতি আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একাত্তরের পরাজিত অপশক্তির নব-উত্থান লক্ষ্য করছি আমরা। যদিও আদালতের আদেশে রাজাকার সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন, তবুও তাদের কেউ ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে, কেউ বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। অর্থাৎ বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন ও পরিবারের সদস্যদের অংশ নেওয়াটা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন ভোটার রয়েছেন। যার শতকরা ২২ ভাগের বয়স ১৮ থেকে ২৮ এর মধ্যে। এই বৃহৎ অংশের প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ এবারই প্রথম ভোট দিবেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রতি দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই নতুন ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল।

স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে বিবেচিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারটি এখনও ঘোষিত হয়নি। তাদের কাছে প্রত্যাশা যুদ্ধাপরাধী ও যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিসহ তাদের বংশ ও চেতনাগত উত্তরাধিকারদের রাজনৈতিক অধিকার রহিতকরণের দাবির প্রসঙ্গটি যেন তারা বিবেচনায় রাখেন।