বায়ুদূষণ ঠেকাতে উঁচু পর্যায়ের কমিটি করতে হবে

বায়ুদূষণ ঠেকাতে উঁচু পর্যায়ের কমিটি করতে হবে

কী কারণে রাজধানীর বাতাস দূষিত হচ্ছে এবং বায়ুদূষণ রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সে বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করতে পরিবেশসচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কমিটিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ঢাকা ওয়াসা, ডেসকোসহ সব পরিষেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের একজন করে প্রতিনিধি, প্রয়োজন হলে একজন বিশেষজ্ঞ রাখতে বলা হয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওই কমিটিকে।একই সঙ্গে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার সব রাস্তা, ফুটপাত ও ফ্লাইওভারে জমে থাকা ময়লা, ধুলাবালি অপসারণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি দিনে কমপক্ষে দুইবার পানি ছিটাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এ বিষয়ে আদেশ দেন। এ ছাড়া পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত।

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই আদেশ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল আদেশের আগে শুনানিতে ঢাকার বিভিন্ন রাস্তা খনন করে ফেলে রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। পরিষেবা দানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানা সময়ে ওই সব রাস্তা খনন করে। আদালত বলেছেন, ‘দুই-এক বছর যেতে না যেতেই একই সংস্থা কর্তৃক খননকাজ করা হচ্ছে। যেসব পাইপ বসানো হয় তা দুই-তিন বছরের বেশি টেকে না কেন? এটা কি টাকার জন্যই করা হয়? নতুন কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি হলে কমিশন পাওয়া যাবে—এ কারণেই কি দুই-তিন বছর পর পর পাইপ বসানো হয়?’ আদালত বলেন, এই কমিশন বাণিজ্য বন্ধ না হলে ঢাকার রাস্তাঘাট কোনো দিনই ঠিক হবে না।

আদালতে আবেদনকারী পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ রাজা এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার তৌফিক ইনাম টিপু।

আদেশের পর অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ঢাকায় বায়ুদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এই মুহূর্তে ধুলাবালি বন্ধ করতে জরুরি নির্দেশনা দরকার। এ জন্য আবেদন করা হয়েছিল। আদালত চার দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এ বি এম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেন, ঢাকার আশপাশে গড়ে ওঠা ইটভাটার কারণে ঢাকার বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এ কারণে হাইকোর্ট ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের জেলায় পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সব ইটভাটা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজন হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে বলে দিয়েছেন আদালত।

ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে গত ২১ জানুয়ারি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল এইচআরপিবি। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত ২৮ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় বায়ুদূষণ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ঢাকার যেসব এলাকায় উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ চলছে সেসব এলাকা (কাজের স্থান) ঘেরাও করে কাজ করা এবং উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের কারণে ধুলাবালিপ্রবণ এলাকায় দিনে দুইবার পানি ছিটাতে ঢাকার দুই সিটির মেয়র ও নির্বাহীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে রুল জারি করেছিলেন। ওই রুল এখন বিচারাধীন। এরই ধারাবাহিকতায় বায়ুদূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে সম্পূরক আবেদন করা হয়। গত ২৪ নভেম্বর এবং গতকাল শুনানি হয় ওই আবেদনের ওপর। শুনানি শেষে আদেশ দেন আদালত।

আদেশের আগে শুনানিতে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ওয়াসা রাস্তা কেটে ফেলে রাখে। ফলে ধুলাবালি রাস্তার পাশে জমা হয়। যখন গাড়ি চলে তখন এই ধুলাবালি বাতাসে ওড়ে। এ ছাড়া ড্রেন পরিষ্কার করে ময়লা না সরিয়ে রাস্তার ওপরই ফেলে রাখে। তা শুকিয়ে আবার ড্রেনে যায় এবং বাতাস দূষিত করে। ফলে পরিবেশ দূষিত হয়। তাই এই ধুলাবালি সরাতে আদালতের নির্দেশনা দরকার। তিনি বলেন, ‘ওয়াসা বা তিতাস বা বিভিন্ন সংস্থা রাজধানীতে যখন কাজ ধরে তখন দেখা যায়, একযোগে সব জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়। এরপর তারা ফেলে রাখে। দীর্ঘদিন এই খোঁড়াখুঁড়ি চলে। ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। তাই একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কাজ শেষ করে অন্য এলাকায় যাতে খোঁড়াখুঁড়ি করে সে জন্য নির্দেশনা দরকার। কারণ উন্নয়নের কথা বলে রাষ্ট্র আমাদের হত্যা করতে পারে না।’ তিনি বলেন, হাইকোর্ট এর আগে এক আদেশে কমপক্ষে দুইবার পানি ছিটানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই নির্দেশ যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে না। কখনো কখনো অভিযোগ করা হচ্ছে, ওয়াসা ঠিকমতো পানি দেয় না। তাই ওয়াসা যাতে পানি দেয় সে জন্য নির্দেশনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও মুন্সীগঞ্জে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া অনেক ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ওই সব ইটভাটা বন্ধ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার কথা। কিন্তু তা ঠিকমতো হচ্ছে না। এ জন্য আদালতের নির্দেশনা প্রয়োজন।

ওই সময় আদালত বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আজ ওয়াসা, কাল তিতাস, আরেক দিন বিদ্যুত্ বিভাগ থেকে রাস্তা কাটা হচ্ছে। এভাবে একেক সংস্থা একেক সময় রাস্তা কাটে। সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে এটা হয়। সিটি করপোরেশন বসে বসে এটা দেখছে। কিন্তু এসব কাজের একটা সমন্বয় থাকা দরকার।’

সিটি করপোরেশনের আইনজীবী বলেন, আদালতের নির্দেশনা মেনে দিনে দুইবার পানি ছিটানো হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে পাঁচবারও পানি ছিটানো হয়।

রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেন, ওয়াসা ড্রেন পরিষ্কার করে সেই ময়লা সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে ড্রেনের পাশেই ফেলে রাখা হয়। এই ময়লা পরে ওই ড্রেনেই পড়ে। ধুলাবালি বাতাসে মিশে যায়। এভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। তাই ওয়াসা যাতে সঙ্গে সঙ্গে ময়লা নিয়ে যায় সে জন্য নির্দেশনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী ঢাকার বাতাস দূষিত হওয়ার মূল কারণ ইটভাটা। ইটভাটাকে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে সে ক্ষেত্রেও কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ারভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী গত রবিবার সকাল ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় ঢাকাই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর। এরপর কয়েক ঘণ্টার জন্য মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোর ও ভারতের কলকাতা শহর দূষণের দিক থেকে ঢাকাকে ছাড়িয়ে যায়। তবে রাত সাড়ে ৮টার পর ঢাকা আবার শীর্ষে চলে আসে। এয়ারভিজ্যুয়ালের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ১৯ নভেম্বর থেকে ১ নম্বরে আছে ঢাকা। বায়ুদূষণের কারণে ঢাকা শহরে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।