সৌদি আরবে নারীকর্মী পাঠানো উচিত কিনা ভাবার সময় এসেছে

সৌদি আরবে নারীকর্মী পাঠানো উচিত কিনা ভাবার সময় এসেছে

সৌদি আরবে আর নারীকর্মী পাঠানো হবে কিনা এ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন অভিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভাপতি ইসরাফিল আলম এমপি। তিনি বলেন, সেখান থেকে আমাদের নারীরা লাঞ্চিত হয়ে, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসছে। তাদের  প্রটেকশন যেকোনোভাবে আমাদের করতে হবে। আর যদি করতে না পারি তাহলে আমাদের মা- বোনদের পাঠাবো না। আমরা এই দৃশ্য দেখতে চাই

আজ বুধবার রাজধানীর ইস্কাটনে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআআইএসএস) অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ইসরাফিল আলম এমপি। ‘নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং নিয়মিত অভিবাসনের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন ও সিভিল সোসাইটির সহযোগীতা’ শীর্ষক দিনব্যাপী মতবিনিময় সভার আয়োজন করে সলিডারিটি সেন্টার বাংলাদেশ-এর সহযোগীতায় ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাইন্ডেশন।

সমাপনী পর্বে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন বিএমইটির পরিচালক ড. নুরুল ইসলাম। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ ছালেহীন। প্যানেল বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন, আইএলও’র ড. উত্তম কুমার দাস, বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী, গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি স্মৃতি আক্তার, সাংবাদিক মোহাম্মদ ওয়াসিম উদ্দিম ভুইয়া ও আরাফাত আরা, ইন্সটিটিউশন অব ইনফরমেটিক্স এন্ড ডেভেলপমেন্টের সিইও সাঈদ আহমেদ।

ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হকের সভাপতিত্বে অন্য সেশনে বক্তব্য রাখেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজা, সোলডারিটি সেন্টার বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর জন হারটো, ওয়ারবি পরিচালক জাসিয়া খাতুন, শ্রমিক নেতা আবুল হোসেন, অভিবাসী অধিকার ফোরামের মো. নাজমুল আহসান, অ্যাডভোকেট ফরিদা ইয়াসমিন প্রমুখ।

ইসরাফিল আলম বলেন, যারা বিদেশে যাচ্ছে তাদের ডাটাবেইস হচ্ছে, কিন্তু যারা ফিরে আসছে তাদের ডাটাবেজ হচ্ছে না। আমরা যেসব ডেডবডি রিসিভ করছি,এই ডেডবডিগুলোর পোস্টমর্টেম হচ্ছে না। কীভাবে মারা গেল? এটা কী টর্চার? হার্ট অ্যাটাক? অ্যাক্সিডেন্ট? আমরা কিন্তু জানি না। তিনি বলেন, সুস্থ্য মানুষ গেল মেডিকেল টেস্ট করে ফিটনেস নিয়ে বিদেশ গেল, আর  ডেডবডি হয়ে ফিরলো।এটার জানার অধিকার ওই পরিবারগুলোর আছে বলে মনে করি। যে মানুষই মৃত্যুবরণ (প্রবাসে) করুক, তার পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা নিরপেক্ষভাবে হওয়া উচিত। আর যারা গর্ভবর্তী হয়ে ফিরছে।কিন্তু কেন ফিরছে? এটা তদন্ত হওয়া উচিত। আমরা যদি ডিএনএ টেস্ট করি তাহলে তো এটা বের হয়ে যায় সন্তানের বাবা কে? কেন এসব আইনের মধ্যে, পলিসিরি মধ্যে, প্রাকটিসের মধ্যে আসবে না? আমি মনে করি তারা আমাদের বোন, আমাদের মেয়ে। তারা ওখানে ওয়ার্কার (কর্মী) হিসেবে গিয়েছে। আমরা তাদের শ্রমিক হিসেবে পাঠিয়েছি। কিন্তু সেখান থেকে তারা যে লাঞ্চিত হয়ে আসছে, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে তাদের প্রতিবিধান-প্রটেকশন যেকোনোভাবে আমাদের করতে হবে। আর যদি করতে না পারি তাহলে আমাদের বোন-মেয়েদের পাঠাবো না।আমরা আমাদের মেয়েদের এই দৃশ্য দেখতে চাই না। আমরা তাদের পাঠাচ্ছি কাজের ভিসায়। শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে।

ছেলেরা কোনো না কোনোভাবে চ্যালেঞ্জ বা সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু মেয়েরা কিন্তু ওভাবে পারে না। আর যদি সত্যি সত্যি নারী শ্রমিক প্রেরণ করতে চাই বা দরকার হয়। তাহলে যে দেশে পাঠাবো সেখানে আমার শেল্টার হাউজ থাকতে হবে। শেল্টার হোম থাকতে হবে। ৪-৫ তলা ডর্মেটরি করতে হবে। মেয়েরা সারাদিন কাজ করবে, সন্ধায় এসে শেল্টার হামে হোমে থাকবে। সকালে কাজের জায়গায় যাবে। তাহলে এই অবস্থা হবে না।

আওয়ামীলীগ দলীয় এই এমপি বলেন, আমরা দেখছি তো মেয়েরা কী অবস্থায় ফেরত আসছে। তাদের সমস্ত শরীরে আঘাতের চিহৃ। ক্ষত-বিক্ষত,রক্তপাত। কোনো মানুষ এভাবে মেয়েদের টর্চার করতে পারে না। গাল্ফ (মধ্যপ্রাচ্য) কান্ট্রিতে মেয়েদের যে ভায়োলেশন দেখলাম, এটা তো বাংলাদেশে কল্পনাও করতে পারি না। বিদেশে আমরা নারী শ্রমিক প্রেরণ করবো কী করবো না। সেটা নিয়ে পর্যালোচনার সময় এসেছে। কারণ ওদের (নারী) মান-মর্যাদা ও সন্মানের সাথে আমাদের লাল সবুজ পতাকার সন্মান জড়িত। আমাদের রাষ্ট্রীয় সন্মান ও মর্যাদার প্রশ্ন জড়িত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই একটি মাত্র কারণে নারী শ্রমিক রপ্তানি বন্ধ করেছিলেন। ইন্দোনেশিয়ার একজন কাজের মেয়ে সৌদি আরবে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটে। তখন নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেয় ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা। নেপালের মেয়েরা মালয়েশিামুখী হয়ে যায়। যখন সৌদিয়ানরা আর কোথাও নারী শ্রমিক পাচ্ছিল না তখন তারা টার্গেট করে এই বাংলাদেশকে। শুরুতে বাংলাদেশ সরকার শক্তভাবেই ধরেছিল। কিন্তু চুক্তির শর্তগুলো তারা ভায়োলেশন করে আসছে। তারা শর্ত অমান্য করে আমাদের মেয়েদের লাঞ্চিত করছে। যখন এগ্রিমেন্ট ভায়োলেশন হয়, মেমোর‌্যান্ডাম অব আন্ডাস্ট্যান্ডিং ভায়োলেশন হয় তখন আর কোনো কিছুর মূল্য থাকে না। তারপরেও আমরা কেন কোন আশা-ভরসায় এই মেয়েদেরকে পাঠাবো?

ইসরাফিল আলম বলেনম আমাদের সচিব সাহেব(প্রবাসী)সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।যারা সৌদিতে যাবে তিন মাস রিক্রুটিং এজেন্সির দায়িত্ব থাকবে, এটা নিয়ম ছিল। এখন বলছেন সৌদি আরব এবং আমাদের দেশের এজেন্টরা এদের দায়িত্ব নেবে। এটা সম্ভব নয়। কারণ ওই দেশে কোনো ক্রাইম বা অকারেন্স হলে বিচার হবে ওই দেশের আইন অনুযায়ী। আমার দেশের আইন অনুযায়ী তো বিচার হবে না। সুতরাং এই জায়গায় আমাদের সরকার ও মন্ত্রণালয়কে (প্রবাসী কল্যাণ) ভিন্নভাবে-নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। কারণ আমার কাছে একটা কেস স্টাডি আছে। একটা মেয়ে সেখানে টর্চার হয়েছে, সেক্সচুয়াল হেরেজ হয়েছে। এটা জানাজানি হয়ে গেছে। সেখানে ওই মেয়ে বিচার প্রার্থী হয়েছে। বিচারে ওই মহিলার জরিমানা করা হয়েছে। কারণ সেখানে নারীর স্বাধীনতা নাই। সবকিছু মিলে বলতে চাই-পুরুষ অভিবাসনের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক অর্জন আছে। এখন নতুন করে আমাদের চিন্তা কর হবে, লোক প্রেরণ করা বড় কথা নয়। যে মানুষগুলো যাচ্ছে তাদের নিরাপত্তা, তাদের কল্যাণ ও কর্ম পরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, ওভারটাইম নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশের মাটিতে যারা গ্রেফতার হয়ে আছে, তারা যেন সাথে সাথে প্রটেকশন পায়।

তিনি বলেন, যারা ভিক্টিম, বিভিন্নভাবে অ্যাভিউজড বা টর্চারের শিকার হয়েছে। দুর্ঘটনাজনিত কারণে আহত নিহত হয়েছে, এসব পরিবারের সাথে লিঙ্কাপ করে দেয়াও আমাদের দায়িত্ব। মিডলম্যান বা মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা ভাইটাল এই মাইগ্রেশন সেক্টরে। কিন্তু তাদের আইনগত ভিত্তি নেই। আইনের মধ্যে না করতে পারলে তারা কিন্তু জবাবদিহীতার মধ্যে আসবে না। তাদের অনিয়ম, সাধারণ মানুষ পরিত্রাণ পাবে না। কারণ রিক্রুটিং এজেন্সি সরাসরি তৃণমূলে কাজ করে না। জেলা উপজেলা পর্যায়ে অফিস নাই। এই মধ্যস্বত্ত্বভোগীরাই কিন্তু কর্মী সংগ্রহ করে। তারা এই সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আইনের মধ্যে আনতে হবে। না হলে সুশাসন আসবেনা এই সেক্টরে।