• মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৫ অপরাহ্ন
  • Bengali Bengali English English
সংবাদ শিরোনাম
একীভূত হচ্ছে ৩০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়টার্সের প্রতিবেদন ; ৫ মিলিয়ন ডলারে মুক্তি পেয়েছে এমভি আব্দুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা করেছে ইরান ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম ইরানের শক্তিশালী ৯ ক্ষেপণাস্ত্র নওগাঁয় ৪২ কেজি ৫০০ গ্রাম গাঁজাসহ গ্রেফতার ২ মান্দায় মদপানে তিন কলেজ ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা নওগাঁর মান্দায় বিষাক্ত মদপানে তিন বন্ধুর মৃত্যু সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করুন: প্রধানমন্ত্রী ঈদের ৫ দিনের সরকারি ছুটি শুরু ঈদুল ফিতর বৃহস্পতিবার ঈদুল ফিতরের তারিখ জানাল সৌদি আরব ১৮ জেলায় ঝড়ের আভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা বিরল সূর্যগ্রহণ আজ, দিন হবে রাতের মতো ঝড় ও বজ্রপাতে তিন জেলায় নিহত ৭ আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

পাহাড়পুর মহাবিহার খননের ১০০ বছর, খননের পথিকৃৎ অক্ষয়কুমার ও শরৎকুমার

প্রজন্মের আলো / ২৭ শেয়ার
Update শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০২৪

——————————————————–
মো. সফিকুল ইসলাম
——————————————————–
  ১ মার্চ ২০২৪, নওগাঁর পাহাড়পুর মহাবিহার খননের একশতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে, অর্থাৎ ‘খনন শতবার্ষিকী’। ১৯২৩ সালের আজকের দিনে এই মহাবিহার সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। এই খননের অমর পথিকৃৎ বাংলার দুই মহান সন্তান। একজন, বাংলার সুবিখ্যাত ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, অপরজন, নাটোর দিঘাপতিয়ার রাজপুত্র কুমার শরৎকুমার রায়। গৌরবের কথা যে, আজ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মহাশয়েরও ১৬২তম জন্মবার্ষিকী (জন্ম- ১৮৬১)।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ঐতিহাসিক পাহাড়পুর মহাবিহারের খননকার্যের প্রধান উদ্যোক্তা। বঙ্গীয় সমাজে পাহাড়পুরের সাংস্কৃতিক সম্পদের বিস্তৃতভাবে প্রথম পরিচয় দেন অক্ষয়কুমারই তাঁর সুললিত রচনার মাধ্যমে। রাজশাহীর বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি’র সভাপতি কুমার শরৎকুমার রায় প্রভাবিত হন অক্ষয়কুমারের জন্যই। মাতৃভূমির ইতিহাস উদ্ধারে তিনি ব্যাকুল হয়ে ওঠেন, একাই খননের ব্যয়ভার বহনের ঘোষণা দেন।
পাহাড়পুর মহাবিহার খননে অক্ষয়কুমারের গৌবরময় অবদান সম্পর্কে সুবিখ্যাত ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার (আর সি মজুমদার) বলেন,—এইরূপ নিয়মিত তথ্যানুসন্ধান এবং পুরাতাত্ত্বিক খননকার্য সমগ্র ভারতবর্ষে অক্ষয়কুমারই সর্বপ্রথম শুরু করেন এবং পথিকৃৎরূপে এটি অক্ষয়কুমারকে অপরিসীম মর্যাদার অধিকারী করেছে’ (Akshay Kumar Maitra, Ancient Monuments of Varendra (North Bengal) : Edited by Kshitish Chandra Sarkar and Ramesh Chandra Majumdar, Varendra Research Society, Rajshahi, 1949, উদ্ধৃত অংশের জন্য দেখুন Ramesh Chandra Majumdar-কৃত গ্রন্থের faroward)।
তিনটি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে পাহাড়পুর মহাবিহার খনন করে,—বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (Archaeological Servey of India)| তবে, প্রধান ও প্রথম উদ্যোগী রাজশাহীর বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি।
বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি ও বরেন্দ্র মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করা কুমার শরৎকুমার রায়ের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। পাহাড়পুর মহাবিহার খনন করাও তাঁর আরেকটি শ্রেষ্ঠ কাজ।
বর্তমান নওগাঁ জেলার বদলগাছি থানার মালঞ্চী গ্রামে পাহাড়পুর মহাবিহার অবস্থিত। পাহাড়পুর মহাবিহার মূলত পাল আমলের একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। এই মহাবিহারের প্রকৃত নাম সোমপুর মহাবিহার। বিশ্ববিশ্রুত পণ্ডিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আচার্য ছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করতে আসতেন।
পাহাড়পুরের ধ্বংসস্তূপ একটি ‘কীর্তিচিহ্ন’ এবং এখানে অমূল্য প্রত্নসম্পদ লুকিয়ে আছে, প্রথম তা অনুমান করেন ইস্ট-ইন্ডিয়া-কোম্পানির জরিপ কর্মকর্তা ডা. বুকানন ফ্রান্সিস হ্যামিল্টন ১৮০৭ থেকে ১৮১২ সালের মধ্যে পূর্বভারতে একটি জরিপ পরিচালনা সময়। তিনি পাহাড়পুর মহাবিহারের ধ্বংসস্তূপটিকে একটি বৌদ্ধযুগের স্তূপা বলে উল্লেখ করেন। এর ৫০ বছর পর দিনাজপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ই. বি. ওয়েস্টম্যাকেট পাহাড়পুর সফর করে একই মত দেন।
হ্যামিল্টন ও ওয়েস্টম্যাকেট বিবরণের জেরধরেই ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের মহাপরিচালক স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯ সালে পাহাড়পুর পরিদর্শন করেন। তখন খনন কাজ শুরু করেও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তিনি খনন বন্ধ করে দেন।
বুকানন থেকে ওয়েস্টম্যাকেট, ওয়েস্টম্যাকেট থেকে কানিংহাম শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও চরম অবজ্ঞা-অবহেলা আর অনাদরে পড়ে থাকে কালের ঐতিহ্য এই মহাবিহারটি। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় গভীর হতাশ হন পাহাড়পুরের প্রতি সরকারি অবহেলায়।
অক্ষয়কুমার মহাবিহারটির সরকারি স্বীকৃতি আদায়ের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। কারণ, তখন এক শ্রেণির মানুষ ধ্বংসস্তূপটির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছিল। ১৯১৫ সালে লিপিযুক্ত পাথরের একটি স্তম্ভ (Pillar inscriptions) অক্ষয়কুমার লোক মারফত প্রাপ্ত হন। অষ্টকোনাকৃতির (Ostagonal) পাথরের এই স্তম্ভ লিপিটিই পাহাড়পুরের প্রথম লিখিত দলিল (ছবি দেখুন)। পাহাড়পুর বিহারের শীর্ষে প্রাপ্ত অমূল্য এই প্রত্ননিদর্শনটি বর্তমানে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের শিলালিপি গ্যালরিতে প্রদর্শনে রয়েছে।
পাহাড়পুরে প্রাপ্ত লিপিযুক্ত স্তম্ভটিকে ভিত্তি করে বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি পরিচালক হিসেবে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের মহাপরিচালক স্যার জন মার্শালের নিকট পত্রাকারে প্রেরণ করেন, ১৯১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। প্রেরিত পত্রে স্তূপটি খনন করার জন্য সরকারকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়।
অক্ষয়কুমারের উক্তরূপ পত্রের সূত্র ধরে ১৯০৪ সালের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত পুরাকীর্তি বা সরকারি সম্পত্তি হিসেবে পাহাড়পুর মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষকে ঘোষণা করা হয় ১৯১৯ সালে।
বলা প্রয়োজন, ১৯১০ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি প্রতিষ্ঠার পরপরই পাহাড়পুর মহাবিহার খননের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় পাহাড়পুরের সভ্যতা-সংস্কৃতি তুলে ধরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় একের পর এক গবেষণামূলক লেখা প্রকাশ করতে থাকেন। বাংলার পণ্ডিত-সমাজ পাহাড়পুরের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন মূলত অক্ষয়কুমারের লেখা পড়েই। একদিকে তিনি জনসমাজের মধ্যে খননের আকাঙ্খা জাগিয়ে তোলেন, অপরদিকে সরকারকে দায়িত্ব সচেতন করে খননে উদ্বুদ্ধ করেন। খননের পূর্বেই তিনি পাহাড়পুর মহাবিহারকে বরেন্দ্র-মণ্ডলের প্রধান স্মৃতিচিহ্ন বলে উল্লেখ করেন (অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, বাঙ্গালীর জীবন-বসন্তের স্মৃতি-নিদর্শন, মানসী ও মর্ম্মবাণী, কলকাতা, ফাল্গুন ১৩২৩)। কুমার শরৎকুমার রায়ও ‘উত্তরবঙ্গের প্রত্নসম্পৎ’ প্রবন্ধ ও অন্য রচনায় পাহাড়পুরের ইতিহাস তুলে ধরেন।
পাহাড়পুর মহাবিহার ধ্বংসস্তূপ সরকারিভাবে প্রথম অনুসন্ধানের প্রায় ১২০ বছর পর শেষ পর্যন্ত খননের মাহেন্দ্রক্ষণ আসে অক্ষয়কুমার ও শরৎকুমারের হাত ধরে। তবে, শেষ মুহূর্তে খননের অনুমতি লাভ করতে নানা ধরনের দেন-দরবার করতে হয়েছে অক্ষয়কুমার ও শরৎকুমার তথা বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতিকে।
কুমার শরৎকুমার রায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রতিবছর দুই হাজার টাকা করে পাঁচ বছর ১০ হাজার টাকা এবং কর্মীদের রাহা খরচ বাবদ বার্ষিক পাঁচশত টাকা হিসেবে পাঁচ বৎসরে আড়াই হাজার টাকা প্রদান করেন, এরপর সরকারি অনুদানও তখন যুক্ত হয়। তাছাড়া, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নিজ তহবিল থেকে কিছু অর্থ প্রদান করেন দেন।
১৯২৩ সালের ১ মার্চ পাহাড়পুর মহাবিহার ধ্বংসস্তূপের খননকার্যের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। এর আগে, জানুয়ারির মধ্যেই জন মার্শালের অনুমোদনসহ খননজনিত প্রাসঙ্গিক কাজ ও চূড়ান্ত প্রস্তুতি সমাপ্ত করা হয়।
খনন উদ্বোধনের দিন অক্ষয়কুমার গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, তবুও স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ অনুরোধে উপস্থিত থাকেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ‘প্রাচীন ভারতে জীর্ণোদ্ধার প্রথা’ শীর্ষক এক আবেগপূর্ণ বক্তব্য রাখেন অক্ষয়কুমার। তাঁর বক্তৃতার পরই বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতির সভাপতি কুমার শরৎকুমার রায় প্রথম কোদাল চালনার মাধ্যমে খনন কাজ উদ্বোধন করেন। স্মারক দিন হিসেবে স্মরণীয় করে রাখার জন্য উদ্বোধনী দিনের খননকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয় অক্ষয়কুমারকে।
পাহাড়পুর খননের দ্বিতীয় দিন থেকে খননের নেতৃত্ব দেন ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের পূর্ব অঞ্চলের সুপারিনটেনডেন্ট ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারমাইকেল প্রফেসর ড. দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর (ডি. আর. ভাণ্ডারকর)।
রাজশাহী কলেজের তৎসময়ের শিক্ষক প্রফুল্লকুমার সরকার পাহাড়পুর মহাবিহার খননে অংশগ্রহণ করেন অক্ষয়কুমার তাঁকে নিজ সঙ্গী হয়ে। প্রফুল্লকুমার সরকার দীর্ঘ স্মৃতিচারণায় রয়েছে পাহাড়পুর খনন বিষয়ে (প্রফুল্লকুমার সরকার, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় : পাহাড়পুরের স্মৃতি, বিশ্বভারতী পত্রিকা, মাঘ-চৈত্র ১৩৬৮, পৃ.- ২৭১-২৭৭)।
কুমার শরৎকুমার রায়ের অর্থায়নে পাঁচ বছরে খননের কথা থাকলেও খনন প্রলম্বিত হয়ে এগার বছর পর্যন্ত পৌঁছে—১৯২৩ থেকে ১৯৩৪। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, কুমার শরৎকুমার রায়, ড. দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর ছাড়াও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন সহকারী অধ্যাপক শ্রীযুক্ত ননীগোপাল মজুমদার, শ্রীযুক্ত জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুমার হেমচন্দ্র রায় শ্রীযুক্ত যতীন্দ্রনাথ খননে অংশগ্রহণ করেন। তাছাড়া, বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়, কে এন দীক্ষিত (কাশিনাথ দীক্ষিত), জি সি চন্দ্র, শ্রীযুক্ত শ্রীরাম মৈত্র এবং বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতি শিক্ষানবীশ কিছু ছাত্র রাজশাহী থেকে খননে অংশগ্রহণ করেন।
পাহাড়পুর মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষের প্রাথমিক খননেই মহাবিহার অনাবৃত হয়। খননকারী দল নিশ্চিত হন যে, প্রধান বিহারকে ঘিরেই এখানকার প্রত্নসম্পদের অস্তিত্ব বিদ্যমান। পাহাড়পুরের প্রত্নসম্পদের মধ্যে কেন্দ্রীয় প্রধান মন্দিরটি স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নিদর্শন।
পাহাড়পুর মহাবিহারে পাওয়া গেছে বিভিন্ন ধরণের প্রত্ননিদর্শন। অবিভক্ত ব্রিটিশ-ভারত যুগে পাহাড়পুর প্রথম পর্বের খনন কাজ সম্পন্ন হয়। তাই এখানে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নবস্তু ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ ভারতবর্ষের বিভিন্ন মিউজিয়ামকে প্রদর্শনের জন্য প্রদান করে। বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম, ছাড়াও কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়াম ও ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম পাহাড়পুরের প্রত্নসম্পদ লাভ করে।
পাহাড়পুরে প্রাপ্ত বিপুল প্রত্নরাজির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো টেরাকোটা (Terra-cotta) বা পোড়ামাটির ফলকচিত্র। পাহাড়পুরে বিভিন্ন পর্বের খননে প্রায় তিন হাজার টেরাকোটা পাওয়া গেছে। বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম ২৬৬টি বিভিন্ন শ্রেণির টেরাকোটা প্রাপ্ত হয়।
পাহাড়পুরের পোড়ামাটির ফলক হতে সর্বপ্রথমে বাংলার নিজস্ব ভাস্কর্য শিল্পের বৈশিষ্ট্যের পূর্ণঅবয়ব পাওয়া যায়—আবহমান বাংলার প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়।
পাহাড়পুর মহাবিহার খনন শ্রীরাজেন্দ্রলাল আচার্য্য গভীর অনুরাগে খননে অক্ষয়কুমারের সঙ্গী ছিলেন। তিনি লিখেন—‘দিঘাপতিয়ার বদান্য কুমার শরৎকুমার রায়,—বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির জীবনসরূপ যিনি,—তাঁহারই অর্থানুকূল্যে যে মহৎকার্যের সূচনা হইয়াছিল গভর্ণমেন্টের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তাহা সুসম্পন্ন করিয়াছেন। পাহাড়পুর এখন বাঙ্গালী মাত্রেরই তীর্থক্ষেত্র—উহা প্রত্নসম্ভারে পরিপূর্ণ নানা যুগের কলাভবন—উহা প্রাচীন বাঙ্গালার শিল্পরীতি ও অভিব্যক্তির গৌরবপূর্ণ জ্বলন্ত নিদর্শন। সেই পাহাড়পুরের খননকার্যের প্রয়োজনীয়তা সরকারকে বিশেষরূপে বুঝাইবার জন্য অক্ষয়কুমার কয়েক বৎসর ধরিয়া যেরূপ যত্নবান হইয়াছিলেন, সেরূপ না হইলে হয়ত বাঙ্গালার প্রাচীন এখনো ভূগর্ভে ঢাকিয়া থাকিত। পাহাড়পুর যে খনিত হইয়াছে উহাও অক্ষয়কুমারের অন্যতম কীর্তি (শ্রীরাজেন্দ্রলাল আচার্য্য, বাঙ্গালার ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, ভারতবর্ষ, কলকাতা, মাঘ ১৩৪৪, পৃ.- ২৮৪-৮৫। )
জাতিসংঘের ইউনেস্কো পাহাড়পুরকে ‘বিশ্ব-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (World Cultural Heritage) হিসেবে ১৯৮৫ সালে স্বীকৃতি (আখ্যাত) প্রদান করে, ইউনেস্কোর নবম অধিবেশনে। ইউনেস্কোর ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্য স্থানের মধ্যে পাহাড়পুর ৩২২তম। পাহাড়পুর এখন বিশ্ব-বাঙালির গৌরবস্তম্ভ। পৃথিবীর সকল মানুষ অমর এই গৌরবের অংশীদার। পাহাড়পুর মহাবিহার খননের পথিকৃৎ হয়ে বাংলার ইতিহাসে কীর্তিমান হয়ে আছেন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও কুমার শরৎকুমার রায়।
—————————————————-
লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ

Categories