আমাদের দেশের মধ্যে কোথাও যে এমন প্রাচীন আমলের লুকায়িত ধন-সম্পদের মত প্রাকৃতিক আভিজাত্য লুকিয়ে থাকতে পারে এটা নওগাঁ জেলার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন পত্নীতলা উপজেলার দিবর দিঘীর মধ্যে অবস্থিত ‘দিব্যক জয়স্তম্ভ’ বা ‘দিবর স্তম্ভ’ না দেখলে বুঝতে পারবেন না।
বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে নওগাঁ জেলার গুরুত্ব অপরিসীম। সেই সঙ্গে নওগাঁ জেলা বাংলাদেশের পরিচিত একটি জেলা। প্রাচীন বাংলার এক সমৃদ্ধ জনপদের নাম বরেন্দ্রভূমি। অনেক দর্শনীয় স্থান, পর্যটন কেন্দ্র থাকলেও এই জেলায় আরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইতিহাসকেন্দ্রিক স্থান। তার মধ্যে একটি দিবর দীঘি। নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলা থেকে ১৬ কি.মি. পশ্চিমে সাপাহার-নওগাঁ সড়কের পাশেই ঐতিহাসিক দিবর দীঘি অবস্থিত। দিবর দীঘির ঐতিহাসিক পটভূমি ছাড়াও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বরেন্দ্র অঞ্চলের বিশেষ ভূমিরূপ এবং আদিবাসী সাঁওতালদের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অন্যতম।
আমরা ফিরে যাই পেছনে: ইতিহাস অনেক কিছু বলে আর এই ইতিহাসই পরিচয় করিয়ে দেয় অজানাকে। তেমন দিবর দীঘির সম্পর্কে জানতে আমরাও তাকাব পেছনে ফিরি।
দিবর স্তম্ভ বা দিব্যক জয়স্তম্ভ বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানার দিবর দিঘীর মধ্যস্থলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এ দিঘী স্থানীয় জনগনের কাছে কর্মকারের জলাশয় নামে পরিচিত। দিঘীটি ৪০/৫০ বিঘা বা ১/২ বর্গ মাইল জমির উপর অবস্থিত। দিবর দিঘীর মধ্যস্থলে অবস্থিত আটকোণ বিশিষ্ট গ্রানাইট পাথরের এতবড় স্তম্ভ বাংলাদেশে বিরল।
পাল বংশকে পরাজিত করে বিজয় অর্জনের স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে দিঘীর মাঝখানে এ জয়স্তম্ভ স্থাপন করা হয়। প্রায় ৬০ বিঘা বা অর্ধ বর্গমাইল জমির উপরে অবস্থিত দিবর দিঘীর দিব্যক জয়স্তম্ভকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দিঘীর চারপাশে মনোরম পরিবেশ। দিবর দিঘীর মধ্যস্থলে আশ্চর্যজনকভাবে স্থাপিত আটকোন বিশিষ্ট অখন্ড গ্রানাইট পাথরের স্তম্ভ বাংলাদেশে বিরল যা সূদুর অতীতের বাঙ্গালীর শৌর্যবীর্যের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
এ স্তম্ভের সর্বমোট উচ্চতা ৩১ ফুট ৮ ইঞ্চি। জরিপকালে পানির নিচের অংশ ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং পানির উপরের অংশ ২৫ ফুট ৫ ইঞ্চি রেকর্ড করা হয়েছে। এ স্তম্ভের ব্যাস ৭৩ সে.মি. (২৯ ইঞ্চি)। প্রতিটি কোনের পরিধি ১ ফুট ৩.৫ ইঞ্চি। এ স্তম্ভে কোন লিপি নেই। স্তম্ভের উপরিভাগ খাঁজ কাটা অলঙ্করণ দ্বারা সুশোভিত যা দেখতে মিনারের মতো গোল। স্তম্ভের উর্ধাংশে আছে পর পর ৩ টি বলয়াকারের স্ফীত রেখা-অলঙ্করন এবং তার উপরে আছে আমলকের অলঙ্করন এবং শীর্ষদেশে আছে স্ফীতরেখার উপরে আমলকের অলঙ্করনের উপরে আছে উষ্ণীষ জাতীয় অলংকরন। স্তম্ভটির নিম্নদেশ খুবই দক্ষতার সাথে বিজ্ঞানসম্মতভাবে তৈরি এবং স্থাপন করা হয়েছিল বলে এত শতাব্দী পরেও তা বিন্দুমাত্র হেলেনি এবং বরাবরের মতো ঋজু অবস্থায়ই জলাশয়ের মাঝে দন্ডায়মান। এই স্তম্ভটির চারপাশের বিশাল দিঘীর নয়নাভিরাম জলরাশি মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের।
বাংলাদেশের এই প্রাচীন জয়স্তম্ভ্ভটি কোন কৈবর্ত্য রাজা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আজ অবধি তা সঠিক জানা যায়নি। অখণ্ড পাথর কেটে তৈরি বহু কোণ বিশিষ্ট্য এই স্তম্ভের এর এক কোণ থেকে আরেক কোণের দূরত্ব ১২ ইঞ্চি। এই বিরট স্তম্ভের উপরিভাগে পর পর তিনটি বলয়াকারে স্ফীত রেখা আছে যা স্তম্ভের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। এর শীর্ষদেশে আছে নান্দনিক কারুকার্য যা বাহ্যত মুকুটাকারে নির্মিত। বর্ণনা মতে, পানির উপরে স্তম্ভের উচ্চতা প্রায় ১০ ফুট, পানির ভেতরে ১২ ফুট এবং মাটির নিচে সম্ভবত আরো ৮-১০ ফুট গ্রোথিত আছে। স্যার বুকানন হ্যামিলটনের মতে, স্তম্ভের সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৩০ ফুট এবং স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের মতে ৩০ ফুট। কানিংহাম ১৮৭৯ সালে যখন এই দীঘি পরিদর্শন করেন তখন এর গভীরতা ছিল ১২ ফুট এবং প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য ছিল ১২০০ ফুট। ধীবর দীঘির এই জয়স্তম্ভটি হাজার বছরের বাংলা ও বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রতীক হিসেবে কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে আজও দণ্ডায়মান। গ্রানাইট পাথরে তৈরি এরকম প্রাচীন স্তম্ভ বাংলাদেশে আর কোথাও নেই।
দিব্যক জয়স্তম্ভের ইতিহাস নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, দ্বিতীয় মহিপালের আমলে ১০৭৫ সালে বাংলার কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। মহিপালের রাজসভায় এই কৈবর্ত্যরা উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিল। দ্বিতীয় মহিপাল ছিল দুর্বল ও চরিত্রহীন শাসক। দ্বিতীয় মহিপালের অযোগ্যতার কারনে বাংলায় অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। কিছু সেনাপতি ও বিপথগামী লোক এ সুযোগে দ্বিতীয় মহিপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং তাকে হত্যা করে। দিব্যক সর্বসম্মতিক্রমে বরেন্দ্রভূমির অধিপতি নির্বাচিত হন। দিব্যকের শাসনামল ছিল ১০৭৫-১১০০ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় মহিপালের সময় তিনজন রাজা বাংলায় শাসন করেন। এরা হলেন – দিব্যক, রুদ্রক ও ভীম। বৃটিশ ভারতীয় বিশিষ্ট ইতিহাস লেখক বুকারন হ্যামিলটন পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলে ঐতিহাসিক স্থানগুলোর উপর জরিপ করে একটি তালিকা প্রনয়নের জন্য এই অঞ্চলে আগমন করেন। তিনি ১৭৮৯ সালে দিঘীর পার্শ্বে এসে উপস্থিত হন এবং জরিপ করেন। বুকারন হ্যামিলটন এ দিঘীটিকে কৈবর্ত্যদের বলে উল্লেখ করেন। তার মতে জনৈক ধীবর রাজা এটি তৈরি করেন। তবে বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার ক্যানিংহামের মতে, একাদশ শতাব্দির কৈবর্ত্য রাজা দিব্যকের ভ্রাতা রুদ্রকের পুত্র প্রখ্যাত নৃপতি ভীমের কীর্তি এটি। এ স্তম্ভের প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও আজ অবধি দিব্যকের কীর্তি বলে অত্র অঞ্চলে প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। ধারনা করা হয়, এই শাসনামলে পাল বংশকে পরাজিত করে বিজয় অর্জনের স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে দিঘীর মাঝখানে এই জয়স্তম্ভ স্থাপন করা হয়।
দেশের সব জায়গা থেকেই জেলা সদর নওগাঁয় আসা যায়। এরপর বালুডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে সাপাহারের বাসে উঠে দিবর দীঘির মোড়ে নামতে হবে। নওগাঁ থেকে দিবর দীঘির দূরত্ব ৫৫ কি.মি.। বাসে সময় লাগবে দেড় থেকে ২ ঘণ্টা। ভাড়া ৬০ টাকা। দিবর মোড় থেকে দিবর দিঘীতে ভ্যান বা অটো রিক্সায় প্রায় দেড় কি.মি. পথ যেতে হবে। ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা। এছাড়া জয়পুরহাট জেলা সদর থেকেও ধামইরহাট এবং পত্নীতলা হয়ে এখানে যাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন:
এবার থাকার কথা বলা যাক, পত্নীতলা উপজেলা সদর নজিপুর পৌর শহরের বাসস্ট্যান্ড কিংবা সাপাহারে কিছু আবাসিক হোটেল আছে (এসি/নন এসি)। তবে এগুলো যদি আপনার মনে না ধরে সেক্ষেত্রে কষ্ট করে নওগাঁ সদরে এলে আপনি ভালো আবাসিক হোটেল পাবেন। এখানে থাকার জন্য ১৫০ থেকে ১৫০০ টাকা মধ্যে রুম পাবেন। এসি রুমও আছে সেক্ষেত্রে বাজেট বাড়াতে হবে। আর খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলো পাবেন হাতের কাছেই।
১. মল্লিকা ইন (থ্রি স্টার), সান্তাহার রোড
(০১৭১৩০১৪০৩৮)
২. হোটেল অবকাশ, সান্তাহার রোড (০৭৪১-৬২৩৫৬)
৩. হোটেল ফারিয়াল, সান্তাহার রোড (০৭৪১-৬২৭৬৫)
৪. হোটেল যমুনা, শহীদ কাজী নূরুন্নবী মার্কেট (০৭৪১-৬২৬৭৪),
৫. হোটেল আগমনী, শহীদ কাজী নূরুন্নবী মার্কেট (০৭৪১-৬৩৩৫১)
৬. হোটেল সরণি, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড (০৭৪১-৬১৬৮৫) ও
৭. আফসার গেস্ট হাউস-সদর হাসপাতাল রোড, নওগাঁ, (০৭৪১-৬৩১৫৩)
দিবর দিঘীর দিব্যক জয়স্তম্ভ ছাড়াও নওগাঁ জেলার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানসমূহ যেমন -পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার,কুসুম্বা মসজিদ, জগদ্দল বিহার, ভীমের পান্টি, বলিহার রাজবাড়ি, আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান, রঘুনাথ মন্দির, রবি ঠাকুরের কুঠি বাড়ী ইত্যাদি ঘুরে আসতে পারেন।