অনলাইন ডেস্ক:
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে ঝুঁকি বাড়ছে। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও খুব বেড়েছে। এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছে ৪০৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৫৭ জন, স্কুলের ২১৯ জন, মাদরাসার ৪৪ জন এবং কলেজের ৮৪ জন।
নারী শিক্ষার্থী রয়েছে ২৪২ জন ও পুরুষ শিক্ষার্থী ১৬২ জন।
শনিবার আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত এক জরিপের প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। জরিপের বিষয়বস্তু ছিল ‘মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একাডেমিক চাপের প্রভাব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা’। কাল সোমবার ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হতে যাচ্ছে। দিবসটি সামনে রেখে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো।
শিক্ষার্থীদের ওপর একাডেমিক চাপ তাদের আত্মহত্যার পেছনে কতটুকু দায়ী এবং অন্য আর কী কারণ জড়িত, তা জানার লক্ষ্যে এই গবেষণাবিষয়ক জরিপ পরিচালিত হয়। জরিপে ৩৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ৪৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট এক হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। জরিপে অংশ নেওয়া মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে পুরুষ ও নারী শিক্ষার্থীর হার যথাক্রমে ৪৩.৯ ও ৫৬.১ শতাংশ।
করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত পড়াশোনা ও কম সময়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠক্রম শেষ করার জন্য এক ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে দেখা গেছে, ৭৭.০১ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে এটি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
শিক্ষার্থীদের ওপর চাপের ধরন
জরিপে অংশ নেওয়া দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৭৫.৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী একাডেমিক চাপের সম্মুখীন। এর মধ্যে পড়াশোনাকেন্দ্রিক চাপের ধরনের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৬.৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, করোনার আগের তুলনায় পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ কমে গেছে। ১০.৩০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে ঘন ঘন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এতে তাঁরা পরিস্থিতি বা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। পরীক্ষার সময়ের চেয়ে সিলেবাসের আধিক্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ১২.৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর। ২০.৭৩ শতাংশ জানান, স্বল্প সময়ে এত বড় কোর্স শেষ করার ফলে তাঁরা পড়া বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ৭৩.৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে। অতিরিক্ত পড়াশোনা ও সিলেবাস দ্রুত শেষ করার চাপে ৬৬.৭১ শতাংশের জীবন প্রভাবিত হয়েছে।
করোনা-পরবর্তী সময়ে এক হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪০ জন বা ২.৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, তাঁরা আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। আত্মহত্যার উপকরণ জোগাড় করেও শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে এসেছেন বলে জানিয়েছেন ৪.৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। করোনা-পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যা করার কথা মাথায় এসেছে ৩৪.১৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৭.৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, নিজস্ব শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত ভয় ও উদ্বেগ তাঁদের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। এর পাশাপাশি দৈনন্দিন আচার-আচরণ ও ব্যবহারে পরিবর্তন, যেমন—মন খারাপ হওয়া, হঠাৎ ক্লান্তি আসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে শিক্ষাজীবনে প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ৮০.৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। ডিজিটাল ডিভাইস, যেমন—মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ডেস্কটপনির্ভরতা শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন ৭০.৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। অতিরিক্ত ঘুম অথবা নিদ্রাহীনতা এসেছে, তাতে ৭১.৭১ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন ধাপে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
৭৬.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, চাকরিক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তার কারণে মানসিক চাপে আছেন। এর মধ্যে রয়েছে ৭২২ জন মেয়ে ও ৫৩৫ জন ছেলে। ৩৮.৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত হতে চান। আবার ৩১.১০ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে বিদেশে ক্যারিয়ার গড়তে চান। বেসরকারি চাকরি করতে আগ্রহী মাত্র ৮.৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ব্যবসা ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থান গড়তে চান ১০.০৬ শতাংশ শিক্ষার্থী।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে জানা যায়, পরীক্ষার ফল ভালো না হওয়ার ভয়ে থাকছেন এক হাজার ২৭৪ জন বা ৭৭.৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে ৬৩.৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী বিভিন্ন মেয়াদে সেশনজটের শিকার হয়ে আটকে পড়েছেন।
শিক্ষকদের সঙ্গে নিজের সমস্যা শেয়ার করা যায় কি না, জানতে চাওয়া হলে ৭৪.৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের মানসিক সমস্যাগুলো শেয়ার করার মতো শিক্ষক পান না। নিজের বা পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকটের চাপে আছেন ২১.০৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। ভালো চাকরি না পাওয়া নিয়ে চাপ বোধ করছেন ১৭.৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। সহপাঠীদের দ্বারা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণে হীনম্মন্যতায় ভুগছেন ৪.৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাঁরা এই চাপের কারণে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিরসনে প্রস্তাব
মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিরসনে আঁচলের পক্ষ থেকে ১০টি প্রস্তাব দেওয়া হয়। আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, একজন শিক্ষার্থী মানে অনেক মানুষের স্বপ্ন। যে সমস্যায় তারা ভুগে থাকে, চাইলে তার সমাধান করা যায়। শিক্ষকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি, মন খুলে কথা বলার মতো সামাজিক পরিবেশ তৈরি ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের এই সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (অবসরপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ এবং বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার চাপ, সামাজিকতা, ব্যক্তিগত হতাশার মতো বিষয় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত ও কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। তা বাস্তবায়নের কাজ সম্পাদনে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। এসংক্রান্ত জাতীয় নীতি ও তার শতভাগ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।