তানভীর রহমান:
দেশের গণপরিবহন ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আইন অনুযায়ী পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে টার্মিনাল ও ঘাটগুলোতে অবাধে চলছে তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রি, বিজ্ঞাপন প্রদর্শন এবং প্রকাশ্যে ধূমপান। বিশেষ করে ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনালে সবচেয়ে বেশি আইন লঙ্ঘনের চিত্র দেখা গেছে। বাসের অভ্যন্তরে ধূমপানের হার কিছুটা কমলেও ফেরি ও লঞ্চের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ডেভেলপমেন্ট অ্যাকটিভিটিজ অব সোসাইটি (DAS) তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত ‘প্রথম ত্রৈমাসিক মনিটরিং সার্ভে প্রতিবেদন ২০২৬’-এ এই চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত দেশের গুরুত্বপূর্ণ ৩টি বাস টার্মিনাল (গাবতলী, মহাখালী, সায়দাবাদ), ২টি ফেরি টার্মিনাল (পাটুরিয়া, আরিচা) এবং ৩টি লঞ্চঘাটে (সদরঘাট, আরিচাঘাট, পাটুরিয়াঘাট) এই জরিপ চালানো হয়।
গাবতলীতে ১৭২ দোকানে তামাক বিক্রি, সায়দাবাদে ২৩
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাস টার্মিনালগুলোতে স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকান এবং ভ্রাম্যমাণ হকারদের মাধ্যমে দেদারসে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। জরিপকৃত এলাকার মধ্যে গাবতলী বাস টার্মিনালে সর্বোচ্চ ১৭২টি দোকানে তামাক বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া মহাখালী বাস টার্মিনালে ৩২টি এবং সায়দাবাদে ২৩টি দোকানে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। দোকানগুলোতে আইন লঙ্ঘন করে সাইনবোর্ড, স্টিকার ও শোকেসে তামাক পণ্যের প্রদর্শন ও বিজ্ঞাপন চলছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, চলন্ত বাসের ভেতর সরাসরি ধূমপানের ঘটনা তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।
ফেরি ও লঞ্চের ভেতর দেদারসে ধূমপান:
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ফেরি ও লঞ্চের অভ্যন্তরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হচ্ছে। পাটুরিয়া ফেরি টার্মিনালের ১১টি স্থায়ী দোকানের সবকটিতেই তামাক পণ্য বিক্রি ও তামাক কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। এছাড়া ফেরির ক্যান্টিন, নিচতলা, ছাদ এবং টয়লেটের পাশে ফেরি স্টাফ, হকার ও যাত্রীদের অবাধে ধূমপান করতে দেখা গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে সদরঘাট ও আরিচা লঞ্চঘাট এবং লঞ্চের ভেতরেও। লঞ্চের ছাদ ও উন্মুক্ত যাত্রী এলাকায় প্রকাশ্যে ধূমপানের কারণে সাধারণ যাত্রীরা প্রতিনিয়ত পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন।
সাইনেজ আছে, প্রয়োগ নেই:
জরিপ এলাকায় দেখা গেছে, কিছু স্থানে ‘ধূমপানমুক্ত এলাকা’ সংক্রান্ত সতর্কতামূলক সাইনেজ বা নোটিশ থাকলেও তা যাত্রীদের আচরণ পরিবর্তনে তেমন ভূমিকা রাখছে না। অনেক জায়গায় এই সাইনেজগুলো পর্যাপ্ত দৃশ্যমান নয়। এছাড়া চালক, হেলপার ও যাত্রীদের একটি বড় অংশের মধ্যে আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং ঘাট কর্তৃপক্ষের নজরদারির দুর্বলতা এর জন্য প্রধানত দায়ী।
সুপারিশসমূহ:
আইন বাস্তবায়নে প্রতিবেদনে বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করা হয়েছে:
১. স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ঘাট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা।
২. টার্মিনাল ও ঘাট এলাকায় মাইকিং, স্টিকার ও ব্যানারের মাধ্যমে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।
৩. পরিবহন খাতের চালক, হেলপার এবং লঞ্চ-ফেরি স্টাফদের জন্য বিশেষ ওরিয়েন্টেশন বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৪. ভ্রাম্যমাণ হকার ও অস্থায়ী দোকানের মাধ্যমে তামাক পণ্যের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।
ডাস্ তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট লিড কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক বলেন, “এই মনিটরিং সার্ভে প্রমাণ করে যে দেশে আইন থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের বড় ঘাটতি রয়েছে। নিয়মিত তদারকি, জনসচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করতে না পারলে ধূমপানমুক্ত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট গড়ে তোলা সম্ভব নয়।”