অদুত রহমান:*
তামাক পরিবেশ, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ মতে, বাংলাদেশে ৩৫.৩ শতাংশ বা প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (১৫ বছর বা বেশি) তামাক ব্যবহার করে থাকে। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের (১৩-১৫ বছর) মধ্যেও ৭ শতাংশ শিশু-কিশোর তামাক ব্যবহারে অভ্যস্ত। অন্যদিকে ৩ কোটি ৮৪ লক্ষ মানুষ ধূমপান না করেও বিভিন্ন গণপরিবহন ও পাবলিক প্লেসে প্রতিনিয়ত পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাবে ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকি অতিমাত্রায় বেড়ে যায়। টোব্যাকো এটলাস ২০১৮’র তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের ফলে প্রতিবছর ১ লক্ষ ৬১ হাজারের বেশি মানুষ অকাল মৃত্যু বরণ করেন। তামাকের এই সর্বগ্রাসী আগ্রাসন ও তামাক মহামারী আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
তামাক চাষ বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ খুবই কম, মাত্র ৩ কোটি ৭৬ লক্ষ ৭ হাজার একর। অথচ তামাক চাষে ব্যবহৃত মোট জমির পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২১ অনুযায়ী, বাংলাদেশে তামাক চাষে ব্যবহৃত মোট জমির পরিমাণ ৯৯,৬০০.২৪ একর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে খাদ্য উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছেন, এমনকি বাড়ির আশেপাশের পতিত জায়গাকে ব্যবহার করে চাষাবাদের কথা বলেছেন, সেখান তামাক চাষের এহেন পরিসংখ্যান আমাদের জন্য মোটেও সুখকর নয়। অন্যদিকে, যুদ্ধ-বিগ্রহ, জলবায়ু পরিবর্তন ও করোনা মহামারীর ভয়ংকর কবলে পড়ে বিশ্ব আজ প্রবল খাদ্য সংকটের সম্মুখীন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে বিশ্বে ৭৯ টি দেশে ৩ কোটি ৪৯ লক্ষ মানুষ চরম মাত্রায় খাদ্য অনিরাপত্তায় ভূগছে। এমতবস্থায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ অগ্রাধিকার হিসাবে বিবেচনায় আনা অতীব জরুরী। তাই খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে তামাক চাষের পরিবর্তে খাদ্য ফসল ফলানোর উদ্যোগ নিতে হবে। যে জমিতে তামাক চাষ করা হচ্ছে, সেখানে খাদ্য ফসল উৎপাদন হতে পারে, কারণ তামাক চাষ মূলত রবি ফসলের মৌসুমেই হয় এবং সে সময় নানা রকম সবজি, ডাল, তৈলবীজ, ধান এসব ফসল না করে এ জমিতে ক্ষতিকর একটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। যা দিয়ে সিগারেট, বিড়ি, জর্দার মতো নিকোটিনযুক্ত নেশা সৃষ্টিকারী পণ্য উৎপাদন করে জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে।
তামাক কেবল খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি নয় পরিবেশের জন্য বড় এক হুমকি এই তামাক। বাংলাদেশে ৩১ শতাংশ বন উজাড়ের জন্য দায়ী তামাক চাষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি ৩০০টি সিগারেটের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ গাছ কাটা হয়। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক হালদা নদীর পানিতে মিশে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটি হুমকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক চাষে অতিরিক্ত যে লাভের কথা প্রচার করা হয়, তার প্রায় সবটাই বানোয়াট। আপাতদৃষ্টিতে তামাক চাষে বেশি আয় উপার্জন হলেও এই আয় থেকে পারিবারিক শ্রমের পারিতোষিক, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত নিজস্ব গাছের/কাঠের দাম, পরিবেশের ক্ষতি, স্বাস্থ্য ব্যয় ইত্যাদি বাদ দিলে তামাক চাষে লাভের বদলে ক্ষতি হয়।
তামাক কোম্পানী চাষীদেরকে তামাক চাষে বীজ, সার, নগদ অর্থসহ নানাবিধ পৃষ্ঠপোষকতার (Intensive) মাধ্যমে সহায়তা করে যাচ্ছে। যার ফলে চাষীরা তামাক ছেড়ে বিকল্প কোন চাষে উৎসাহিত হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশসহ বিশে^র নিম্ম ও মধ্যম আয়ের দেশে তামাকের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সার্বিকভাবে গোটা জনস্বাস্থ্য।
তামাক চাষের ক্ষতি থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য তামাক কোম্পানিগুলো প্রায়শই অপকৌশলের আশ্রয় নেয়, নিজেদের অত্যন্ত পরিবেশ বান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করে। তথাকথিত সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কর্মসূচির (সিএসআর) মাধ্যমে তামাক কোম্পানিগুলো তাদের ঘটানো ক্ষতি আড়াল করে এবং দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। উদাহরণ হিসেবে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি)-এর কথা বলা যেতে পারে। কোম্পানিটি প্রায়শই বেশ গর্ব করে নিজেদের সিএসআর কর্মসূচি ‘বনায়ন’ এর প্রচার করে থাকে। কোম্পানিটির দাবি, গত চার দশকে তারা লক্ষ লক্ষ গাছের চারা বিতরণ করেছে। আপাতদৃষ্টিতে বেশ মহতী উদ্যোগ মনে হলেও প্রকৃত সত্য হলো তামাকপাতা শুকাতে জ্বালানির জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশে অন্তত ২৯ লাখ পুর্ণ বয়স্ক গাছ কাটা হয়। এধরনের সিএসআর কার্যক্রমের আড়ালে কোম্পানিটি মূলত স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সঙ্গে সর্ম্পক স্থাপন করে, যা পরবর্তীতে তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রণয়নে হস্তক্ষেপ করতে এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ উদ্ধারে কাজে লাগায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যেসব এলাকায় চাষিরা বিএটিবি’র জন্য তামাক চাষ করে, মূলত: সেসব এলাকাতেই কোম্পানিটি সিএসআর কার্যক্রম করে থাকে। যার মূল উদ্দেশ্য, তামাক চাষের কারণে অত্র এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ ও ইকোসিস্টেম এর ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ে, তা আড়াল করা।
তামাক মহামারী এবং এর ফলে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ও রোগের প্রতি বিশ^ব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষন করার জন্য ১৯৮৭ সাল থেকে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে প্রতিবছর ৩১ মে বিশ^ তামাকমুক্ত দিবস পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবারের ন্যায় এবারো বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে বিশ^ তামাকমুক্ত দিবস ২০২৩। দিবসটি পালনে বাংলাদেশে এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো ‘তামাক নয়, খাদ্য ফলান’ (Grow food, not tobacco)|
আশার কথা, সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (২০১৩ সালে সংশোধিত)’-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য এফসিটিসি’র আলোকে একটি খসড়া প্রস্তাবনা প্রণয়ন করেছে। যে খসড়াটিতে তামাক কোম্পানীর সিএসআর সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকল্পে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ”স্মোকিং জোন” নিষিদ্ধ করা; তরুন-কিশোর ও নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষার জন্য খূচড়া শলাকা বিক্রয় নিষিদ্ধ ও তামাকজাত দ্রব্য প্রদশর্ণী ও ই-সিগারেটসহ সকল প্রকার ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্ট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। খসড়া সংশোধনীটি পাশ হলে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের দুর্বলতাগুলো দূর হবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল বা এফসিটিসি’র সুপারিশসমূহের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বৈশ্ব্যিক সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণের আলোকে বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি বৈশ্ব্যিক মানদন্ডে উপনীত হবে।
পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত করার যে ঘোষণা ২০১৬ সালে সাউথ এশিয়ান স্পিকারদের শীর্ষ সম্মেলনে দিয়েছেন, সে লক্ষ্যে আমরা অগ্রসর হবো।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারের কিছু পদক্ষেপ নেয়া সত্ত্বেও এখনও বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। খসড়া সংশোধনীটি পাশ হলে একই সঙ্গে দেশে তামাকের ব্যবহার হ্রাস এবং এর মারাত্মক স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তামাক ব্যবহারের ফলে প্রতিবছর যে এক লাখ ৬১ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয় সেটি কমানো সম্ভব হবে। এছাড়াও তামাক ব্যবহারজনিত কারনে উৎপাদনশীলতা হারানো এবং চিকিৎসা বাবদ বছরে যে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় তা কমানো সম্ভব হবে।
——————————
*প্রোগ্রাম অফিসার
স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন
০১৬২-৫৮৫৫৯৯৬