অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান রিজভী:
বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো তাদের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারকারীদের প্রতি দুইজনের একজনের প্রাণ কেড়ে নেয়। ফলে বছরে ৪ মিলিয়নেরও অধিক লোক মৃত্যুবরণ করে। অসংক্রামক রোগের যে সকল প্রতিরোধযোগ্য কারন রয়েছে তার মধ্যে তামাক অন্যতম। জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরী।
শুধুমাত্র জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, পরিবেশ সুরক্ষার্থেও তামাকের ব্যবহার কমানো প্রয়োজন। তামাক কোম্পানি পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় পরিবেশ দূষণকারী। তামাক ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব এবং পরোক্ষ ধুমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে ১৯৮৭ সাল থেকে ৩১ মে দিনটিকে বিশ্বব্যাপী তামাকমুক্ত দিবস হিসাবে পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “তামাকমুক্ত পরিবেশ, সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ” (Tobacco: Threat to our environment)|
বিশ্বব্যাপী তামাক সরবরাহ চেইন জলবায়ূর স্থিতিস্থাপকতা হ্রাস, সম্পদের অপচয় এবং বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করছে। আবার এই তামাক কোম্পানিগুলোই জনগণের মনোযোগ সরানোর উদ্দেশ্যে নামমাত্র সামাজিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষায় নিজেদের অবদান রাখার প্রচারণা চালায়। আন্তর্জাতিক চুক্তির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইনের কারণেই কোম্পানিগুলো এ ধরণের কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ অব্দি সকল প্রক্রিয়া পরিবেশগত দিক থেকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
উল্লেখ্য ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) অনুসারে তামাকের প্রচার প্রচারণা, বিজ্ঞাপন, পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যার মধ্যে তামাক কোম্পানি কর্তৃক সিএসআর কর্মসূচীগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশেও এই কর্মসূচীর ক্ষেত্রে কোম্পানির নাম, সাইন, ট্রেডমার্ক, প্রতীক, ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কিন্ত কোম্পানিগুলো আইনের এ ধারা লংঘন করেই সিএসআর কর্মসূচী পরিচালনা করছে।
তামাকজাত দ্রব্য তৈরির ফলে উৎপাদিত হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য। প্লাস্টিকের থলি বা পাউচে নির্বিচার ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পন্য বাজারজাতকরণ প্রতিনিয়ত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ^জুড়ে প্রতি বছর ৪.৫ ট্রিলিয়ন সিগারেটের বর্জ্য ফেলা হয়। বাংলাদেশে গেøাবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (GATS) ২০১৭ অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৫ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ধূমপায়ী এবং একজনের প্রতিদিন ধূমপান করা সিগারেটের গড় সংখ্যা ৯.১। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ১২৩ মিলিয়ন সিগারেটের বাট উৎপন্ন হয়।
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি নিরাপদ পানি সরবরাহের নামে এসডিজি এর ৩ নম্বর গোল অর্জনে সহায়তা করছে বলে দাবী জানায়। পানি ও পরিবেশ বিধ্বংসী এ সকল কার্যক্রম আড়াল করার জন্য ২০২২ সালে “Groundwater: Making the Invisible Visible” শ্লোগানকে সামনে নিয়ে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি (বিএটি) কর্তৃক “প্রবাহ” নামে সামাজিক কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে বিশ্ব পানি দিবস পালন করতে দেখা গেছে। অথচ, প্রকৃতপক্ষে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তামাক পানি, পরিবেশ এবং জীব বৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
ধূমপান ঘর-বাড়ি এবং আবাসিক ভবনে আগুন লাগার কারণ হিসেবেও চিহ্নিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এরকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। তামাকের ধোঁয়া অভ্যন্তরীণ এবং বাহিরের পরিবেশকে দূষিত করে এবং সিগারেট নিভে যাওয়ার অনেক সময় পরও বিষাক্ত পদার্থের নি:স্বরণ ঘটতে থাকে। তামাক চিবানোর ফলে তৈরী হওয়া থুতু পরিবেশকে অত্যন্ত দূষিত, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর করে তোলে।
বাংলাদেশে Environmental, Social and Governance (ESG) মানদন্ড বিবেচনায় তামাক কোম্পানি নিজেদের ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরেছে। এ বিষয়ে টেকসই বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে সাধারণত ESG মানদন্ডের জন্য কোম্পানির প্রকৃত, মুখ্য পণ্য বা পরিসেবাগুলোর স্থায়িত্বকে মোটেই বিবেচনা করা হয় না। কোম্পানিগুলো কী কাজ করে সে বিষয়ের পরিবর্তে তারা কিভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে সেদিকে নজর দেওয়া হয়।
এমতাবস্থায় জীবন বিধ্বংসী পণ্য নিয়ন্ত্রণে আমাদের সুপারিশ-
* তামাক কোম্পানি থেকে সরকারের শেয়ার প্রত্যাহার
* তামাক চাষ নীতি চুড়ান্তকরণ
* এফসিটিসির আর্টিক্যাল ৫.৩ অনুসারে আচরণ বিধি প্রণয়ন
* কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট আইন এবং অন্যান্য বিষয়গুলো তামাক নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ও যুগোপযোগী করা।
* ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদনকারী তামাক কোম্পানিগুলোকে পুরুস্কার প্রদান থেকে বিরত থাকা।
—————————————–
[1] https://exposetobacco.org/wp-content/uploads/Talking_Trash_BN_.pdf
[2] https://exposetobacco.org/bn/bbt?utm_source=fca&utm_medium=email&utm_campaign=bbt
[3] BAT, ESG Report, 2021
[4] PROBAHO’s pure drinking water creating hopes for rural life (tbsnews.net)
[5] Sustainable Development Goals
* সভাপতি, প্রজন্ম মানবিক অধিকার উন্নয়ন কেন্দ্র
* সম্পাদক, প্রজন্মের আলো