তাহেরা রহমান:
বান্দাইখাড়া ডিগ্রী কলেজের কম্পিউটার প্রদর্শক ও হাটকালুপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ আনোয়ার হোসেন তরফদারের পিতা, প্রবীণ বিএনপি নেতা মরহুম মোঃ যবেদুর রহমান তরফদার (বুদা) বুধবার সকালে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর সকল গুনাহ ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমীন।
মরহুম যবেদুর রহমান তরফদার (বুদা) ছিলেন এলাকার একজন সুপরিচিত, সজ্জন ও জনদরদি মানুষ। জানা গেছে, তিনি ৭ জানুয়ারি ১৯৭৯ সালে মাত্র ৫০ পয়সা চাঁদা দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগদান করেন এবং প্রতিষ্ঠালগ্নের কর্মীদের একজন ছিলেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি কারাবরণও করেন; চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলস্টেশন থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনি বান্দাইখাড়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মরহুমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের স্নেহধন্য শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান রিজভী। শোকবার্তায় তিনি বলেন, যবেদুর রহমান তরফদার (বুদা) ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল, উদার ও সমাজকল্যাণে নিবেদিত একজন মানুষ। তাঁর সহযোগিতায় তৎকালীন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মরহুম ডা. এনায়েত উল্লাহর বাসার নিচতলায় প্রজন্ম কম্পিউটার কলেজ প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এবং এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে কোচিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি বান্দাইখাড়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।
রিজভী আরও বলেন, বুদা আঙ্কেল ও মরহুম ডা. এনায়েত উল্লাহর উৎসাহ ও সহযোগিতা এলাকার শিক্ষা বিস্তার ও তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের অবদান স্থানীয় জনগণের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এছাড়া অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান রিজভী সোসাল মিডিয়া ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে লিখেন, “ব্যক্তিগতভাবে বুদা আঙ্কেলের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। বান্দাইখাড়া ডিগ্রী কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত অবস্থায়, সদ্যপ্রয়াত আমার সহকর্মী হারুনুর রশিদ উজ্জলের বাসা ভাড়া নিয়ে আমি প্রজন্ম কম্পিউটার কলেজ প্রতিষ্ঠা করি। পরবর্তীতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি আরও উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে বুদা আঙ্কেল আমাকে তৎকালীন হাটকালুপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মরহুম জনাব ডা. এনায়েত উল্লাহ সাহেবের কাছে নিয়ে যান।
আমরা ডা. এনায়েত উল্লাহ সাহেবের বাসার নিচতলার একটি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার অনুরোধ জানাই। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে রাজি হয়ে যান। বাসা থেকে বের হওয়ার পর আমার মনে হলো—ভাড়ার টাকার বিষয়টি তো নির্ধারণ করা হয়নি। তখন আমরা আবার ফিরে গিয়ে বিষয়টি জানতে চাই। বুদা আঙ্কেল যখন ভাড়ার কথা তুললেন, তখন ডা. এনায়েত উল্লাহ সাহেব বললেন, “এলাকার তরুণ-তরুণীরা কম্পিউটার শিখবে, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। তাই রিজভীর কাছ থেকে কোনো ভাড়া নেওয়া হবে না। শুধু সবাইকে ভালোভাবে কম্পিউটার শেখাবে।”
এই মহানুভবতা আজও আমার হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে।
সেই প্রতিষ্ঠানের বারান্দায় আমি এলাকার বহু শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রাইভেট কোচিং করিয়েছি। অনেক অভিভাবক পারিশ্রমিক দিতে চাইলেও গ্রহণ করিনি। অসংখ্য শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিয়েছি। পরবর্তীতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, আত্রাইয়ের সহযোগিতায় বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করি। ২০০০-০১ সালে সর্বপ্রথম কম্পিউটার প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করি এবং এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার আয়োজন করি। এসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ডা. এনায়েত উল্লাহ সাহেবকে আমন্ত্রণ জানাতাম। এলাকার মানুষের কল্যাণে নানা সমাজসেবামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করেছি। সেই সময়ের অনেক শিক্ষার্থী আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।
পরবর্তীতে প্রজন্ম কম্পিউটার কলেজ-এর নাম পরিবর্তন করে বান্দাইখাড়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ প্রতিষ্ঠা করি। ডা. শাহ মো. এনায়েত উল্লাহ সাহেবের এডাপ্টেট ডটারের সঙ্গে তিনি আমাকে বিবাহ দেন। জীবনে নানা উত্থান-পতন, সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছি। অনেক জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছি। সেসব ঘটনা আমার লিখিত আত্মজীবনীতে, ইনশাআল্লাহ, বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হবে।
আলহামদুলিল্লাহ, হয়তো অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশি সফল হতে পারিনি, কিন্তু মানসিক শান্তি পেয়েছি। আল্লাহ তাআলা আমাকে ঈমান ও সালাতের ওপর অটল রেখেছেন—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বুদা আঙ্কেলের ইন্তেকালে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মরহুম জনাব ডা. এনায়েত উল্লাহ সাহেবকেও। তাঁদের দুজনের অবদান, আন্তরিকতা ও মানবিকতা আমার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এবং চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ডা. শাহ মো. এনায়েত উল্লাহমৃত্যু বরণ করেন।
আল্লাহ তাআলা মরহুম মোঃ যবেদুর রহমান তরফদার (বুদা) এবং মরহুম জনাব ডা. এনায়েত উল্লাহ সাহেব—উভয়ের কবরকে জান্নাতের বাগিচাসমূহের একটি বাগিচায় পরিণত করুন, তাঁদের সকল গুনাহ মাফ করে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমীন।”