পারভেজ গাদ্দাফী
আত্রাই (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
মহাশ্মশান-শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের মনে এক গভীর নীরবতা নেমে আসে। এটি শুধু মৃতদেহ সৎকারের স্থান নয় বরং জীবনের চরম সত্য, জন্ম-মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এবং মানবতার চিরন্তন শিক্ষা বহনকারী এক পবিত্র প্রাঙ্গণ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহাশ্মশান অত্যন্ত ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থান।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে বলরামচক গ্রামে আত্রাই নদীর পাড়ে অবস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বলরামচক মহাশ্মশান। ইতিহাস ঘেটে ও লোকমুখে জানা যায়, প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশত বছর আগে ইসলাম গাথী গ্ৰামের রায় জমিদার বলরামচক মহাশ্মশানের গোড়াপত্তন করেন। পাঁচুপুর গ্ৰামের তৎকালীন বিত্তবান বাবুরা এই মহাশ্মশানের দেখা শোনা করতেন। জমিদার বাবুরা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সকলে মিলে মহাশ্মশানে দেখভাল করে আসছে।দীর্ঘকাল ধরে আত্রাই উপজেলা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মৃত শেষকৃত্য এই মহাশ্মশানেই সম্পন্ন হয়ে আসছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বেও প্রতিষ্ঠানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। প্রতি বছর এখানে ঐতিহ্যবাহী “বান্নির মেলা ও কালী পূজা” অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, আত্রাই নদীর তীরে অবস্থিত এই মহাশ্মশানের সিঁড়িঘাটসহ কিছু অবকাঠামো কাজ এখনও অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে পুরাতন চিতায় শেষকৃত্যের কাজে ভোগান্তি পোহাতে হয় ধর্মপ্রাণ মানুষদের। শ্মশানে আগত ভক্তদের জন্য আশ্রয় ছাউনির কাজ এখনো অসম্পন্ন।
বলরামচক গ্রামের বাসিন্দা ডাঃ ধীরেন্দ্রনাথ বলেন, আমাদের বাপ-দাদারা নিজেদের অর্থায়নে শ্মশানের অনেক কাজ করে গেছেন। সরকারি অনুদান খুবই সীমিত। সম্প্রতি আমরা সকলে মিলে নিজ উদ্যোগে একটি নতুন চিতা নির্মাণ করেছি। কিন্তু এখনও সিঁড়িঘাট, বসার স্থান ও মহাশ্মশানের নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা বেষ্টনীর আরও কাজ প্রয়োজন। শ্মশানে আসা দর্শনার্থীদের জন্য এবং শ্মশানের প্রয়োজনে একটি সিঁড়িঘাটের বিশেষ প্রয়োজন।
মহাশ্মশান পরিচালনা কমিটির সভাপতি শ্যামল কুমার মন্ডল জানান, প্রায় এক বছর আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিঁড়িঘাট নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজ শুরু হলেও প্রাকৃতিক কারণে তা সম্পূর্ণ করা যায়নি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘাটটির পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক।
এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা প্রকৌশলী নিতিশ কুমার বলেন, ঘাট নির্মাণের বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। রেজুলেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খুব দ্রুত অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা হবে।
স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায় ও এলাকাবাসী মনে করেন, সিঁড়িঘাট, শ্মশানে আগত মানুষদের জন্য আশ্রয় ছাউনির নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পন্ন হলে এই ঐতিহ্যবাহী মহাশ্মশানের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি, মেলাসহ বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে আগত মানুষের সুবিধা নিশ্চিত হবে।এলাকাবাসী প্রশাসনের সদিচ্ছা ও আশ্বাসে আশাবাদী। তারা আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত কাজ সম্পন্ন হলে শতবর্ষী এই মহাশ্মশান আরও সুন্দর, নিরাপদ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে সমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে।
একটি মহাশ্মশানের উন্নয়ন মানে শুধু একটি ধর্মীয় স্থানের উন্নয়ন নয়। এটি মানবিক দায়িত্ব ও সামাজিক সৌহার্দ্যের প্রতিফলন। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিত্তবানদের সম্মিলিত উদ্যোগে মহাশ্মশানগুলো সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা অত্যন্ত জরুরি। এতে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা পাবে, পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধও আরও সুদৃঢ় হবে।