সৈয়দা অনন্যা রহমান*
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সদস্য রাষ্ট্রগুলো ১৯৮৭ সাল থেকে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালন করে থাকে। দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য তামাকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা তৈরি করা। প্রতিবছর দিবসটির একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। এবছরও দিবসটির একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। “Unmasking the appeal – countering nicotine and tobacco addiction” বাংলায়- “প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি” এবারের প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে মূলত, তামাক কোম্পানিগুলো তরুণদের মধ্যে নিকোটিন ও তামাক আসক্তি তৈরির জন্য যে সব কৌশল ব্যবহার করে, সেগুলো মোকাবেলায় সোচ্চার হবার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই বছরের প্রচারণার তিনটি মূল লক্ষ্য :
• তামাক কোম্পানিগুলোর প্রচারণা কৌশল উন্মোচন করা।
• শক্তিশালী নীতির পক্ষে জনমত তৈরি করা।
• তরুণ জনগোষ্ঠী এবং জনগণকে কোম্পানির কৌশল সম্পর্কে জানানো এবং প্রতিরোধে সক্ষম করে তোলা।
তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কিশোর ও তরুণদের আসক্ত করতে সিগারেট এর পরিবর্তে নতুন ধরনের উচ্চ আসক্তি সৃষ্টিকারী পণ্য তৈরি করেছে। যেমন : ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট এবং সিন্থেটিক নিকোটিন ডিভাইস। নানা কৌশলে তরুণদের মাঝে এসব পণ্যগুলোকে আধুনিক, নিরাপদ এবং আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে, বাংলাদেশে ই-সিগারেট ও অন্যান্য উদীয়মান তামাকজাত পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ তরুণদের স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ ও আসক্তির ঝুঁকি তৈরি করেছে। তামাক নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে এলেই কোম্পানিগুলো নীতি নির্ধারকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে তামাক থেকে রাজস্ব আয়ের বিষয়টি। প্রকৃত পক্ষে তামাক থেকে রাজস্ব আয়ের তুলনার স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। ২০২৪ সালের একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির হয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলো কখনোই এসব তথ্য সামনে আনছে না।
সারা পৃথিবীতেই তামাক ও নিকোটিন উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্যের ক্ষতিকর দিক আড়াল করতে নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করছে। এসব কৌশল তরুণদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে আসক্তি তৈরি করছে। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণে অর্জিত অগ্রগতি নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তামাক কোম্পানিগুলো সাধারণত যে-সব কৌশল ব্যবহার করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
• আকর্ষণীয় ডিজাইনের মোড়ক বা প্যাকেট তৈরি করে বাজারজাত করা।
• নানা ধরনের সুগন্ধী বা ফ্লেভার যুক্ত করা (বিশেষত তরুণদের আকৃষ্ট করতে)
• ইন-সিগারেট ও নতুন নিকোটিন পণ্য “কম ক্ষতিকর” উল্লেখ করে ব্যাপক প্রচারণা চালায়।
• সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের আড়ালে নিজেদের পণ্যের ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করা
তামাক কোম্পানিগুলো প্রচার করে, ই-সিগারেট বা ভেপ এক ধরনের “নিরাপদ বিকল্প” এবং সিগারেট এর চেয়ে কম ক্ষতিকর। এটি পুরোপুরি ভুল ধারণা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ই-সিগারেট বা ভেপ মোটেও নিরাপদ পণ্য নয়। বরং উচ্চমাত্রায় আসক্তি সৃষ্টিকারী পণ্য। তরুণদের আকর্ষিত এবং আসক্ত করে তোলার জন্য ই-সিগারেট -এ বিভিন্ন ফল ও ক্যান্ডির ফ্লেভার মেশানের হয়। প্রকৃতপক্ষে এ সব নতুন ও উদীয়মান নিকোটিন পণ্যগুলিতে উচ্চমাত্রায় নিকোটিন থাকে যা দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। তামাক কোম্পানিগুলোর এ ধরনের কৌশল তামাক নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে কষ্টার্জিত সাফল্যগুলোর প্রতি মারাত্মক হুমকি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, সারা বিশ্বে ১৩-১৫ বছর বয়সি ৪ কোটি শিশু বর্তমানে অন্তত একটি তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করে। এদের মধ্যে ২ কোটি শিশু সিগারেট এবং ১ কোটি শিশু ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে। এছাড়াও, ১৩-১৫ বছর বয়সি অন্তত দেড় কোটি কিশোর-কিশোরী ইতোমধ্যেই ই-সিগারেট ব্যবহার করছে। যেসব দেশ থেকে এ ধরনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে, সেখানে প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ভ্যাপিং গড়ে ৯ গুণ বেশি।
এ সব নতুন ও উদীয়মান নিকোটিন পণ্যগুলির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তরুণদের সুরক্ষায় ২০২৫ সালে প্রণীত ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশটিতে ই-সিগারেট, ভেপ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচ উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিক্রয় ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে মহান জাতীয় সংসদে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইনটি পাস করার সময় ই-সিগারেট, ভেপ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট ও নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধের বিধানটি বাদ দেওয়া হয়। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বাংলাদেশে সব ধরনের তামাক পণ্যের সহজপ্রাপ্যতা এবং সহজলভ্যতা, কম দাম, আসক্তি সৃষ্টিকারী ই-সিগারেট ও নতুন নিকোটিন পণ্য নিয়ন্ত্রণে কোনো আইনগত বাধা না থাকা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে তরুণদের মধ্যে এসব পণ্য ব্যবহারের ঝুঁকি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। একইসাথে তামাক ও নিকোটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব নীতি প্রণয়ন ও তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, তামাক পণ্য ও নিকোটিন পণ্যের আকর্ষণ কমাতে এবং আসক্তি প্রতিরোধে দ্রুত এ বিষয়ে পৃথক আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। তামাক নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দিয়ে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করার এখনই সময়।
*হেড অব প্রোগ্রাম, (স্বাস্থ্য অধিকার বিভাগ) ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট